বিশ্বায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতি। এর বিপরীতে পাল্টা ব্যবস্থার দিকে হাঁটছে দেশটির অনেক বাণিজ্য অংশীদার। যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থানে। আনাদোলুর এক প্রতিবেদন অনুসারে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এছাড়া বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার-নির্ভরতা হ্রাসের চেষ্টা বাড়ছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) মার্কিন ডলার সূচক ১১ শতাংশের বেশি কমে ৯৭-এ দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৭৩ সালের পর কোনো প্রথমার্ধ বিবেচনায় ডলারের সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। গত ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপকভাবে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের ঘোষণা দেন। এর পর থেকেই ডলার সূচক ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে খণ্ডিত অবস্থা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের ডলার থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করছে। এর বিপরীতে স্বর্ণ মজুদের পাশাপাশি ইউরো ও ইউয়ানের মতো বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে তারা।
বছরের শুরু থেকে ডলারের বিনিময় হার ইউরোর তুলনায় ১২ শতাংশের বেশি কমেছে। এর পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। শুল্কনীতি দেশটির আমদানি-রফতানির ঘাটতি কমালেও ঋণ বাবদ খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ডলারের ওঠানামার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজস্ব মুদ্রার মান পেগ বা স্থির করে রেখেছে চীন। এর ফলে ইউয়ানের বিনিময় হার অতিরিক্ত বাড়ে বা কমে না, যা রফতানিকারকদের জন্য অনুকূল। এতে ইউরোপসহ প্রধান বাজারে চীনা রফতানি মূল্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। যার কারণে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ চীনা পণ্য সস্তায় কিনতে পারে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জোট ব্রিকস সম্প্রতি ডলার-বহির্ভূত লেনদেনের উদ্যোগকে আরো গতিশীল করেছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে জানিয়েছেন, মার্কিন মুদ্রাকে ধ্বংস করার এ চেষ্টা তিনি প্রতিরোধ করবেন।
গবেষণা সংস্থা অফিশিয়াল মনিটারি অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ফোরামের (ওএমএফআইএফ) এক জরিপ অনুসারে, বিশ্বের ৮০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্কিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশ নেয়া ব্যাংকগুলোর ১৬ শতাংশ ১২-২৪ মাসের মধ্যে ইউরোর মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ৩২ শতাংশ বলেছে, তারা স্বর্ণের মজুদ বাড়াতে চায়।
এদিকে ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজস্ব ও বৈদেশিক নীতি বিনিয়োগকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ত্যাগ করতে উৎসাহিত করছে। একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প বাজেট ঘাটতি কমাতে পারেননি।
বিশ্বব্যাপী বিভক্ত আর্থিক বাজারে ইউরো বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে; এমনটাই মত ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দের। তার ভাষ্যে, দেশগুলো যখন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করছে এবং বহুপক্ষীয় চুক্তি কমে যাচ্ছে, তখন ইউরো বড় ভূমিকা নিতে পারে, যা ডলার নির্ভর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে।
ক্রিস্টিন লাগার্দে আরো বলেন, ‘ইউরোর শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভূমিকা অর্থায়নের খরচ কমাতে পারে, মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা হ্রাস করতে পারে এবং ইউরোজোনকে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।’
গত মাসে চীনের পিপলস ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা একক মুদ্রানির্ভর ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে।’
বর্তমানে মার্কিন সরকারি ঋণ ৩৭ ট্রিলিয়ন বা ৩৭ লাখ কোটি ডলার। যা চলতি দশকের শেষ নাগাদ ৪৭ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সরকারি কর রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশই এখন সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে, যা মার্কিন বন্ডবাজার এবং ডলারের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি গৃহীত হচ্ছে, যার মাধ্যমে ডলার-সমর্থিত স্টেবলকয়েন সারা বিশ্বে সহজলভ্য হবে। একে মার্কিন ঋণ ব্যবস্থাপনা সহজ করতে একটি দ্রুত ও বাস্তবমুখী সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। একদিকে ডলারের বিনিময় হার সুরক্ষার চেষ্টা রয়েছে দেশটির। অন্যদিকে রফতানি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্বল ডলারের সুবিধা নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডি-ডলারাইজেশনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো কার্যকর বিকল্পের অনুপস্থিতি। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবিন ব্রুকস বলেন, ‘চীনা ইউয়ানের ওপর কড়া রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোজোনের ঋণজনিত সীমাবদ্ধতা—এ দুই কারণে মুদ্রা দুটি ডলারের যথাযথ বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।’
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্বল ডলার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে। বিশেষত যেসব দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য দুর্বল। এর মধ্যে রয়েছে হাঙ্গেরি, তুরস্ক, মিসর, চিলি, মালয়েশিয়া ও কলম্বিয়া।
তবে ইউয়ানের বিনিময় হার বৃদ্ধিতে ধীরগতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতাকে সীমিত করে রেখেছে। তবুও ডলারের পতন উদীয়মান বাজারের মুদ্রা ও বন্ডকে বাড়তি প্রণোদনা দেবে বলে মত অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের। ফলে উদীয়মান বাজারের সম্পদ ও স্বর্ণ ভবিষ্যতে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।